জন্ডিস রোগের কারণ,
লক্ষণ ও প্রতিকার
জন্ডিস (Jaundice) কোন রোগ নয় বরং এটি অসুখের উপসর্গ যাতে শরীরের চামড়া ও চোখ হলুদ বর্ণের হয়ে যায়। শরীরে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এর প্রধান কারণ। সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা শুরু না করলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। রক্তে বিলিরুবিন নামক হলুদ রঞ্জক পদার্থের স্বভাবিক মাত্রা < ১.০-১.৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। আর শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে গেলে তা বাইরে থেকে বোঝা যায়। কিছুক্ষেত্রে প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ হয়ে যেতে পারে। শরীরের চামড়া ফ্যাকাশে দেখায় বলে আগের দিনে একে পাণ্ডুরোগ বলা হত। আসুন জেনে নিই রোগটির কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে।
জন্ডিস কী?
শরীরের চামড়া, মিউকাস মেমেব্রেণ এবং চোখ হলুদ হয়ে যাওয়াকে সাধারণত জন্ডিস বলা হয়। পুরনো লোহিত রক্তকণিকা আমাদের শরীরে সবসময় বিলিরুবিন উৎপন্ন করে, যা প্রধানত পায়খানার মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। যদি কোন কারণে শরীর থেকে এই বিলিরুবিন বের হতে না পারে তাহলে অধিক বিলিরুবিন শরীরে জমে জন্য জন্ডিস হয়।
এছাড়া জন্ডিসের কারণে শরীরে আরও অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
★জন্ডিসের কারণ সমূহ
জন্ডিস হল চোখ ও প্রসাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া।
এতে অনেকসময় পায়খানা সাদা হয়ে যেতে পারে।
শরীরে চুলকানি হতে পারে।
জন্ডিস এর কারণে যকৃত শক্ত হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া শারীরিক দুর্বলতা সহ জ্বর, বমি, পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি প্রায়ই লেগে থাকতে পারে।
জন্ডিস হবার প্রধান কারণের মধ্যে-
যকৃতের কার্যক্ষমতার উপর চাপ পড়া।
যকৃত অকেজো হয়ে যাওয়া।
বিলিরুবিন পিত্ত থেকে অন্ত্রে প্রবেশ করতে না পারা।
শিশুদের ক্ষেত্রে পিত্তনালী চিকন থাকা বা তৈরী না হওয়া (Biliary Atresia) ও জন্ম থেকেই বিলিরুবিনের তৈরী ও নি:সরণে সমস্যা থাকলে জন্ডিস হতে পারে।
আরবড়দের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ, বি,সি, ডি, ই এর যেকোন একটি ভাইরাস জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে, অতিরিক্ত মদ পান করলে, জীবাণুর সংক্রমণে, টিউমার বা পিত্তপাথুরীর জন্য পিত্তনালী বন্ধ বা সংকীর্ণ হয়ে গেলে জন্ডিস হতে পারে।
এছাড়া জন্ম থেকেই বিলিরুবিন প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকলে ও রক্ত অতিরিক্ত ভাঙ্গার কারণে রক্তশূণ্যতা হলে জন্ডিস হয়ে থাকে।
★কখন ডাক্তার দেখানো উচিত?
শিশু বা বড়দের শরীরের ত্বক,
চোখ ইত্যাদি হলুদ হয়ে গেলে সাথে সাথে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
★জন্ডিস হলে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়ঃ
রক্ত পরীক্ষা।
যকৃতের কার্যকারিতা এবং কোলেস্টরল পরীক্ষা।
প্রোথোম্বিন টাইম।
পেটের আল্ট্রাসাউন্ড।
প্রস্রাব পরীক্ষা।
যকৃতের বায়োপসি।
★জন্ডিসের প্রতিষেধকঃ
সময়মত হেপাটাইটিস এ এবং বি’র প্রতিষেধক টিকা নেওয়া জন্ডিস থেকে বেঁচে থাকার সবচেয়ে উত্তম উপায়।
এজন্য দেহে জন্ডিসের জীবাণু আছে কিনা তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে টিকা রোগ হওয়ার আগেই টিকা দিয়ে নিতে হবে।
জন্ডিস একবার হয়ে গেলে টিকা নিয়ে কোনো লাভ হবেনা।
তাই সুস্থ থাকা অবস্থাতেই আগেই টিকা নিয়ে নিতে হবে।
হেপাটাইটিস বি’র জন্য প্রথম মাসে একটি, দ্বিতীয় মাসে একটি বা ছয়মাসের মধ্যে একটি ডোজ দেওয়া হয়।
আর হেপাটাইটিস এ’র ক্ষেত্রে একটি ডোজই যথেষ্ট।
আর দুই ক্ষেত্রেই পাঁচ বছর পরপর বুস্টার ডোজ টিকা দেওয়া হয়ে থাকে।
★জন্ডিসের যত্ন ও চিকিৎসাঃ
আগে জন্ডিস এর তেমন খুব একটা ভাল চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না।
কিন্তু এখন হাতের কাছেই চিকিৎসা পাওয়া যায় এর চিকিৎসা।
নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারী হাসপাতালে সহজে পাওয়া যায় এর চিকিৎসা।
এছাড়া বাড়ীতে বসে জন্ডিস রোগীর যত্ন নেওয়ার জন্য যে যে বিষয় খেয়াল রাখতে হবে সেগুলো হলো-
জন্ডিসের চিকিৎসা শুরু করার আগেই তা হওয়ার কারণসমূহ খুঁজে বের করতে হবে।
তারপর কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবেজন্ডিস রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করাতে হবে।
তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা ফল বা ফলের রস খেতে দিতে হবে।
রান্না সহ সকল কাজে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা জরুরী।
সবসময় হাতের নখ কেটে ছোট করে রাখতে হবে।
রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম দিতে হবে।সবসময় খাবার-দাবার ঢেকে রাখতে হবে।
অবশই স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে হবে।
জন্ডিসের চিকিৎসা সাধারণত রোগের ধরণ, মাত্রা, রুগীর বয়সের উপর নির্ভর করে।
তাই যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে সেগুলো হলো-
জন্ডিস হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খেতে হবে।
এছাড়া ডাক্তারের অন্যান্য সকল উপদেশ মেনে চলতে হবে।
শিশুদের ফিজিওলজিকাল জন্ডিস হলে তাদের জন্য লাইট থেরাপী চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।
নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে বিলিরুবিনের মাত্রা মারাত্মক বা অধিক আকার ধারণ করলে রক্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
জন্ডিস হলে অনেকে অ্যাসপিরিন বা ঘুমের ওষুধ খেয়ে থাকে এটা কখনই উচিত নয় ।
এছাড়া পরিপাকতন্ত্রে জমে থাকা জীবাণুগুলো যাতে কোন প্রকার প্রদাহ তৈরি করতে না পারে সেজন্য রোগীকে প্রতিদিন কমপক্ষে একবার হলেও পায়খানা করা নিশ্চিত করতে হবে।
জন্ডিস কোনো রোগ না হলেও একে মোটেও অবহেলা করা ঠিক নয়।
জন্ডিসের চিকিৎসায় অনেকে ঝাড়ফুঁক দিয়ে থাকেন আবার কেউ রোগীকে অতিরিক্ত হলুদ দিয়ে রান্না করা খাবার ও বিভিন্ন গাছের শেকড় খেতে দেন যা রোগীকে আরও বিপদগ্রস্থ করে ফেলতে পারে।
তাই জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই সময় নষ্ট না করে সরাসরি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
★জন্ডিসের প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ
জন্ডিস যেহেতু কোনো রোগ নয়, তাই এর তেমন কোনো ওষুধও নেই। স্বাভাবিকভাবেও ৭ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে শরীরের রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে গেলে জন্ডিস এমনিতেই সেরে যায়।
সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, জীবাণুমুক্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে জন্ডিসের আক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব।
রাস্তাঘাটে খোলা পানি, নোংরা ফলের জুস, শরবত ইত্যাদি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
জন্ডিস হলে রোগীকে পুরোপুরিভাবে বিশ্রামে থাকতে হবে।
এছাড়া রোগীকে প্রচুর পরিমানে শর্করাজাতীয় এবং ভিটামিন-সি যুক্ত খাবার খেতে হবে।
গ্লুকোজ, আখের রস, আনারস ইত্যাদি জন্ডিস রোগীর জন্য অনেক উপকারী খাবার।
এছাড়া জন্ডিসের কারণ যকৃতের কার্যকারিতার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
তাই যকৃতের কার্যকারিতা যেন ভালো থাকে সেদিকে লক্ষ্য সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হবে।
অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত খাবার বাদ দিয়ে সুষম খাবার খেতে হবে।
মদ্যপান, ধূমপান, শিরাপথে নেশা দ্রব্য নেওয়া ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে ও সময়মত জন্ডিসের টীকা নিয়ে নিতে হবে।
মানুষের মাঝে জন্ডিস বিষয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারনা রয়েছে। তাই অযথা ভ্রান্ত চিকিৎসার স্বরনাপণ্য না হয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা করা জরুরী। এছাড়া নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, জীবাণুমুক্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণ করাই জন্ডিসের আক্রমণ থেকে বাঁচার মূলমন্ত্র।
তাই রাস্তাঘাটে পানি, ফলের জুস, সরবত ইত্যাদি খাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে।
আসুন নিয়ম মেনে চলি ও জন্ডিসের প্রকোপ থেকে বেঁচে থাকি।
No comments:
Post a Comment