Saturday, 29 September 2018

মেরুদন্ড ব্যথার কারণসমূহ ও প্রতিকার

মেরুদন্ড ব্যথার কারণসমূহ ও প্রতিকার
ঘাড়, পিঠ ও কোমরের ব্যথার অভিজ্ঞতা কমবেশী সবারই রয়েছে।
মেরুদন্ডে প্রথম পর্যায়ে ব্যথা তেমন অনুভূত না হলেও পরবর্তীতে তা শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

চলুন জেনে নিই মেরুদন্ডে ব্যথার হওয়ার বিভিন্ন কারণ ও তা থেকে পরিত্রানের উপায় সন্মন্ধে।
মেরুদন্ড ব্যথার কারণ:
গঠন অনুযায়ী মেরুদন্ড মাথার খুলির নীচে ঘাড়ের ৭টি হাড়, পিঠের ১২টি হাড় এবং সবার নিচে কোমরের ৫টি হাড় নিয়ে গঠিত।
মেরুদন্ডের ব্যথা বিভিন্ন কারনে হতে পারে।
উৎপত্তি ও লক্ষন প্রকাশের স্থান আলাদা হওয়ায় সঠিকভাবে এই রোগ নির্ণয় করা একটু কঠিনও বটে।
এর জন্য অনেক সময় সঠিকভাবে এর চিকিৎসা করাও কঠিন হয়ে যায় ।
মেরুদন্ডের হাড়গুলির ভিতর দিয়ে মাথার খুলি থেকে নেমে আসা রগ বা স্পাইনাল কর্ডে দুই হাড়ের মধ্যবর্তী ডিস্কের কোন অংশ বের হয়ে গিয়ে চাপের সৃষ্টি করলেই ব্যথাটা হয়।
ডিস্কের স্থানচ্যুতি বা সরে যাওয়ার মাত্রার উপর এর জটিলতা নির্ভর করে। 
তাই সঠিক সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

★★মেরুদন্ডের বিভিন্ন অংশে ব্যথার লক্ষনসমুহ:
ঘাড়ের ব্যথা
দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় ব্যথা অনুভব করা।
প্রাথমিক ভাবে কাঁধে ও হাতে ব্যথা হওয়া।
ব্যথা ঘাড় হতে হাতে ছড়িয়ে পড়া।
হাতের বিভিন্ন অংশে ঝিন-ঝিন, শিন শিন করা।
হাতের বোধশক্তি কমে আসা ও পর্যায়ক্রমে অসারতা অনুভূত হওয়া।
হাত দূর্বল হয়ে ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়া।

পিঠের ব্যথা:
দাঁড়ানো ও বসা থাকা অবস্থায় পিঠে ব্যথা করা।
বুক ও পিঠের চারপাশে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া।

কোমর ব্যথা:
দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় কোমরে ব্যথা অনুভূত হওয়া।
ব্যথা কোমর থেকে ক্রমান্নয়ে পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া।
পায়ের মাংস পেশীতে ব্যথা অনুভূত হওয়া।
পায়ের বিভিন্ন অংশে ঝিন-ঝিন, শিন শিন করা।
পায়ের বোধশক্তি কমে আসা ও কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়া।

★★মেরুদন্ডে ব্যথার প্রতিকার সমুহ:-
ফিজিওথেরাপিঃ
কোমর ব্যথাজনিত সমস্যার অত্যাধুনিক চিকিৎসা হচ্ছে ফিজিওথেরাপি। 
এই চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসক রোগীকে ইলেকট্রোম্যগনেটিক রেডিয়েশন, আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, লেজার থেরাপি ও বিভিন্ন প্রকার ব্যয়ামের মাধ্যমে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন ।
তবে ব্যয়াম করার আগে আপনার জন্য কী ধরনের ব্যয়াম প্রযোজ্য তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিতে হবে। কারণ ভূল ব্যয়ামের কারণে সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

ফার্মাকোথেরাপি:
চিকিৎসকরা রোগীকে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সাধারণত ব্যথানাশক ওষুধ, মাসল রিলাক্রজেন জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করে থাকেন। 
যেহেতু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে সেজন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎকের পরামর্শমতো সেবন করা আবশ্যক।

সার্জারিঃ
যদি দীর্ঘদিন ফার্মাকোথেরাপি ও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা চালানোর পরও রোগীর অবস্থার পরিবর্তন না হয় রোগীকে অবস্থা অনুযায়ী কোমর-মেরুদন্ডের অপারেশন বা সার্জারীর প্রয়োজন হতে পারে।
সার্জারীর পরবর্তীতে রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নির্দেশমত নির্দিষ্ট ব্যয়াম দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে হয়।

মেরুদন্ডের ব্যথা প্রতিরোধে করণীয়:
মেরুদন্ডের ব্যথা ভালো হওয়ার পর আবারও দেখা দিতে পারে। 
যেহেতু ব্যথা বারবার দেখা দিতে পারে ও যারা এখনো সমস্যায় ভোগেননি তারা দৈনন্দিন কাজে নিচের কিছু প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও পরামর্শসমূহ মেনে চলতে পারেন।

নিচ থেকে কিছু তোলার সময় অবশ্যই হাঁটু ভাজ করে তুলুন।
 কখনও কোমর ভাঁজ করে কিংবা ঝুঁকে কিছু তুলবেন না।
কোন কিছু বহন করার সময় ঘাড়ের ওপর তুলবেন না।
ভারী জিনিসটি আপনার শরীরের কাছাকাছি রাখুন।
 পিঠের ওপর ভারী বিছু বহন করার সময় সামনের দিকে ঝুঁকে বহন করুন।
১০ মিনিটির বেশি একটানা দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
হাঁটু না ভেঙে সামনের দিকে ঝুঁকবেন না।
দীর্ঘক্ষণ হাঁটতে বা দাঁড়াতে হলে উচু হিল পরবেন না।
অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হলে কিছুক্ষণ পরপর শরীরের ভর এক পা থেকে অন্য পায়ে নিন।
গাড়ি চালানোর সময় স্টিয়ারিং হুইল থেকে দূরে সরে বসবেন না।
সোজা হয়ে বসুন।
কোমর ব্যথা বেশি হলে বিছানা থেকে শোয়া ও ওঠার সময় কিছু নিয়ম পালন করা দরকার।
 চিৎ হয়ে শুয়ে এক হাঁটু ভাজ করুন। 
এবার ধীরে ধীরে এক পাশ কাত হোন।
পা দুটি বিছানা থেকে ঝুলিয়ে দিন, এবার কাত হওয়া দিকের হাতের কনুই এবং অপর হাতের তালুর ওপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসুন। 
দুই হাতের উপর ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে দাঁড়ান।


মেয়েরা যেসব নিয়মকানুন মেনে চলবেন:
অল্প হিলের জুতো বা স্যান্ডেল পরুন।
তরকারি কাটা, মসলা পেষা, কাপড় কাচা ও ঘর মোছার সময় মেরুদন্ড সোজা রাখুন।
সাধারণ অবস্থায় এবং কোমর সোজা রাখুন।
কোমর ঝুঁকে বাচ্চাকে কোলে নেবেন না ।
ঝাড় দেওয়া ও টিউবওয়েল চাপার সময় কোমর সোজা রাখবেন।
পানি ভরা কলস বা বালতি, ভারী আসবাবপত্র তুলতে প্রথমে হাঁটু ভাজ করে বসুন এবং কোমর সোজা রাখুন।
মার্কেটিং বা শপিংয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকতে হলে ১০ থেকে ১৫ মিনিট দাঁড়ানো বা হাঁটার পরে বিশ্রামের জন্য একটু বসুন।
বিছানা গোছানোর সময় কোমর ভাঁজ না করে বরং হাঁটু ভেঙে বসুন।


দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় রোগীরা সাধারণত ব্যথানাশক বা পেইন কিলার খেয়ে ব্যথা দূর করার চেষ্টা করেন।
তবে দীর্ঘদিন ব্যথানাশক খেলে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে।
তাই ঘাড়, পিঠ ও কোমর ব্যথায় অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

No comments:

Post a Comment