Sunday, 30 September 2018

হেপাটাইটিস এ

হেপাটাইটিস এ
___________________

হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাসের সংক্রমনে সৃষ্ট একটি তীব্রসংক্রামক রোগ যা প্রদাহ সৃষ্টি করে যকৃতের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটায়।
হেপাটাইটিস এ,
(হেপাটাইটিস বি, সি, ডি এবং ই,) ভাইরাসের মধ্যে  এটি অন্যতম।
শিশু কিংবা বড় যে কারোরই এই রোগ হতে পারে।
হেপাটাইটিস এ ভাইরাসের সংক্রমনে অনেক ক্ষেত্রে কোন উপসর্গই দেখা যায় না বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গ দেখা যায়।

সাধারনত সংক্রমণ এবং উপসর্গের মধ্যে দুই থেকে ছয় সপ্তাহের ব্যবধান থাকে এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর মোটামুটিভাবে আট সপ্তাহ স্থায়ী হয়।

উপসর্গসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:-
👉 জ্বর,
👉তলপেটে ব্যথা,
👉 বমি বমি ভাব বা বমি,
👉উদরাময়,
👉ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

আবার কিছু ক্ষেত্রে, প্রাথমিক সংক্রমণের পরবর্তী ছয় মাস সময়ে উপসর্গসমূহ আবার ফিরে আসতে পারে।
মৃদু বা হাল্কা হেপাটাইটিস এ এর ক্ষেত্রে তেমন কোন চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। সাধারনত এই রোগে যারা আক্রান্ত হন, তারা কোন রকম যকৃতের ক্ষতি ছাড়াই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সু্‌স্থ হয়ে ওঠেন।
কিছু ক্ষেত্রে যকৃতের তীব্র বিকলতা হতে পারে বিশেষ করে প্রবীণ মানুষদের ক্ষেত্রে।
দূষিত খাবার ও পানি গ্রহণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তি সংস্পর্শে আসলে এই রোগ হতে পারে।

কিভাবে ছড়ায়
১. এটা সাধারণত সংক্রামিত মল দ্বারা দূষিত খাবার বা পানি পানের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
আবার আক্রান্ত ব্যক্তির রান্না করা বা পরিবেশন করা খাবার খেলে,

২. মারাত্মকভাবে হেপাটাইটিস ‘এ’ আক্রান্ত এলাকায় বসবাস বা ভ্রমণ করলে,

৩. হেপাটাইটিস ‘এ’ আক্রান্ত কোন ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে,

৪.  ধূমপান বা যেকোনো মাদক সেবন করলে কিংবা সংক্রামিত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বা স্পর্শের মাধ্যমেও এটা ছড়াতে পারে।

হেপাটাইটিস এ এর উপসর্গ
অনেক ক্ষেত্রে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও কোন উপসর্গই দেখা যায় না,
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
আবার শিশুরা সংক্রমিত হলে বেসিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে কোনো উপসর্গ দেখা যায় না, কিন্তু তাদের থেকে অন্যদের সংক্রমণ হতে পারে।
সাধারনত হেপাটাইটিস এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবার এক মাস পর পর্যন্ত এর কোন লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না।
যদি উপসর্গ দেখা যায়, তখন সেগুলো মোটামুটি আট সপ্তাহ স্থায়ী হয়।

উপসর্গসমূহ হল :-
👉 অবসাদ অনুভব করা,
👉 বমি বমি ভাব হওয়া বা বমি করা,
👉 উদরাময়,
👉 ত্বক এবং চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া,
👉 তলপেটে ব্যথা,
👉 ক্ষুদা মন্দা,
👉 জ্বর,
👉 মাংসপেশীতে ব্যথা,
👉 চুলকানি,
👉গাঢ় রংয়ের প্রস্রাব ইত্যাদি।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা
যেহেতু হেপাটাইটিস এ এর উপসর্গগুলো অন্যান্য অনেক রোগের উপসর্গসমূহের অনুরূপ, তাই রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হয়ে থাকে।

চিকিৎসা
শিশুদের ক্ষেত্রে এটা সাধারনভাবে তেমন বিপজ্জনক নয়।
একবার সংক্রমণ হওয়ার পরে একজন মানুষের মধ্যে তার অবশিষ্ট জীবনের জন্য এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়।
এর কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি নেই।
চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে বমি বমি ভাব বা উদরাময়ের জন্য বিশ্রাম ও ওষুধের পরামর্শ দিতে পারেন। সাধারনভাবে এই রোগ সম্পূর্ণরূপে সেরে যায় এবং যকৃতের কোন সমস্যা থাকে না।
কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে যকৃতের চরম বিকলতা ঘটলে, যকৃত প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।

যেহেতু হেপাটাইটিস ‘এ’র কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
তাই, হেপাটাইটিস ‘এ’ আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসকেরা কিছু ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেন।

যেমন-

👉পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নিতে হবে।
👉পানি ভালভাবে ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে পান করতে হবে।
👉প্রচুর পরিমানে পানি বা তরল খাবার গ্রহন করতে হবে।
👉বমি বমি ভাবের ফলে কোন কিছু খেতে ইচ্ছে না করলে, সারাদিন অল্প অল্প করে হালকা ও সহজে হজম হয় এমন খাবার খেতে হবে।
👉ধূমপান, অ্যালকোহল বা অন্য যেকোন মাদক বর্জন করতে হবে।
👉পুষ্টিকর খাবার গ্রহন করতে হবে।
👉 নিয়মিত সুষম খাদ্য যেমন- শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে।
👉খাবার রান্নার সময় ভালো করে সিদ্ধ করতে হবে।
👉বাসী বা পঁচা খাবার খাওয়া যাবে না।
👉হোটেলের খাবার না খাওয়াই ভাল।
👉রান্নার আগে হাত ভালভাবে ধুতে হবে।
👉খাওয়ার আগে ও পায়খানা ব্যবহারের পর হাত ভালভাবে সাবান দিয়ে ভালভাবে ধুতে হবে।
👉আক্রান্ত ব্যক্তিকে রান্না করা বা রান্না পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে হবে।
👉চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবনের পাশাপাশি তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।

হেপাটাইটিস এ প্রতিরোধে করনীয়

১. বারে বারে হাত ভালোমত পরিষ্কার করতে হবে।
২. খাবার যথাযথভাবে রান্না করা।
৩. হেপাটাইটিস ‘এ’ প্রতিরোধে হেপাটাইটিস ‘এ’ এর ভ্যাকসিন নিতে হবে।
৪. মারাত্মকভাবে হেপাটাইটিস ‘এ’ আক্রান্ত এলাকায় ভ্রমন বা বসবাসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।
৫. কাচা ফল, সবজি এবং অন্যান্য খাবার ভাল করে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করে খেতে হবে।
৬. অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে এবং খাবার সবসময় গরম করে খেতে হবে।
৭. আক্রান্ত ব্যক্তির রান্না বা পরিবেশন করা খাবার খাওয়া যাবে না।
৮. আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা বা তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করা যাবে না।
৯. কোন কারনে রক্ত গ্রহনের প্রয়োজন হলে ভালভাবে দাতার রক্ত পরীক্ষা করে নিতে হবে।
১০. ধূমপান, অ্যালকোহল বা যেকোনো ধরনের মাদক বর্জন করতে হবে।

হেপাটাইটিস এ এর টিকা
হেপাটাইটিস ‘এ’ প্রতিরোধে হেপাটাইটিস এ টিকা বেশ কার্যকর।
একবার এই টিকা নিলে এটা সারা জীবনের জন্য কার্যকর থাকে।
কিছু দেশে শিশুদের জন্য এবং যাদের আগে এই টিকা দেওয়া হয়নি এমন মানুষদের জন্য এটা নিয়মিতভাবে সুপারিশ করা হয়।

হেপাটাইটিস ‘এ’ এর সংক্রমনে জটিলতা
অনেক ক্ষেত্রেই এ রোগ একা একাই ভাল হয়ে যায়।
আবার কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস ‘এ’র লক্ষণ বা উপসর্গ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়েও অনেক বেশী স্থায়ী হয় কিংবা লক্ষণ বা উপসর্গ ভালো হয়ে যাওয়ার পরও তা আবার ফিরে আসে।
কিছু ক্ষেত্রে যকৃতের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায় বা যকৃত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে।

সবশেষে
হেপাটাইটিস ‘এ’ এর সংক্রমনের ঘটনা অনেক হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোন উপসর্গ দেখা যায় না।
অনেক ক্ষেত্রেই রোগী একা একাই সুস্থ্য হয়ে যায়।
এ রোগে একবার আক্রান্ত হলে শরীরে এই রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
উন্নয়নশীল দেশের অনেক শিশুই ১০ বছরের কম বয়সেই এই ভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হয়, আবার একা একা সুস্থ্যও হয়ে যায়।
হেপাটাইটিস ‘এ’ এর টিকা নিলে সারা জীবনের জন্য এটা এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেয়।
তাই শিশু ও যারা এই ভাইরাসের টিকা নেননি, তারা এই টিকা নিয়ে এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারেন।
হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২৮ জুলাই তারিখে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়।

কথায় আছে – রোগ বালাই বলে কয়ে আসে না।
কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়।
যেকোনো অসুখ মারাত্মক আকার ধারণ করার আগে নানা ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়।
আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সেসব উপসর্গকে গুরুত্ব সহকারে দেখি না।
ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানো যায় না।
অথচ সামান্য একটু সচেতনতাই পারে যেকোনো অসুখ প্রকট আকার ধারণ করার আগে আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে।
তাই যে কোন রোগে বিলম্ববনা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন,
সুস্থ্য থাকুন,

লেখক -নুরুজ্জামান
ফার্মাসিস্ট, সৌদিয়া আরব,

হেপাটাইটিস কি? এর চিকিৎসা,

হেপাটাইটিস

হেপাটাইটিস বলতে যকৃতের প্রদাহ (ফুলে যাওয়া) বোঝায়।
ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণ বা অ্যালকোহলের মত ক্ষতিকারক পদার্থের কারণে ঘটা যকৃতের একটি রোগ। হেপাটাইটিস অল্প কিছু উপসর্গসহ বা কোনো উপসর্গ ছাড়াই  ঘটতে পারে। 
তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে জন্ডিস, এনরেক্সিয়া (ক্ষুধমান্দ্য) ও অসুস্থতাবোধ এর লক্ষণ বা উপসর্গ।

দুধরণের হেপাটাইটিস দেখা যায় :
তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী।
তীব্র হেপাটাইটিস ৬ মাসেরও কম স্থায়ী হয়, অন্য দিকে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে।
মূলত হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে এই রোগটির সূত্রপাত, তাছাড়া  অ্যালকোহল, নির্দিষ্ট কতগুলো ওষুধ, শিল্প-জৈব দ্রাবক এবং উদ্ভিদের টক্সিক জাতীয় পদার্থের কারণে এই রোগটি ঘটে।

হেপাটাইটিসের ধরণ:

 হেপাটাইটিসের সাধারণ ধরণগুলোর মধ্যে পড়ে-

হেপাটাইটিস্ :
 হেপাটাইটিস্ এ রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ এ ভাইরাস।
এটি সবচেয়ে পরিচিত হেপাটাইটিস্ রোগ। এটি সাধারণত সেইসব জায়গায় দেখা যায় যেখানে স্যানিটেশন ও বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুব খারাপ।
সাধারণত দূষিত খাদ্য ও জল-আহারের মাধ্যমে এর সংক্রমণ ঘটে।
এটি স্বল্পমেয়াদি রোগ, যার উপসর্গগুলো সাধারণত তিন মাসের মধ্যে চলে যায়। হেপাটাইটিস এ রোগ হলে ইবুপ্রোফেন জাতীয় পেনকিলার দেওয়া ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।
টিকাকরনের মাধ্যমে হেপাটাইটিস এ প্রতিরোধ করা যায়।
সংক্রমণের সম্ভাব্য স্থানগুলোতে যেমন; ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকা, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, দূরপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপ যাঁরা ভ্রমন করেন তাঁদেরকে হেপাটাইটিস রোগের টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।

হেপাটাইটিস বি: 
হেপাটাইটিস্ বি  রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ বি ভাইরাস।
রক্ত ও বীর্য এবং যোনি তরলের মত শরীরের তরলে এটি সংক্রমিত হয়।
এটি সাধারণত অসুরক্ষিত যৌন মিলন বা ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মাধ্যমে রক্তের মধ্যে সংক্রমিত হয়।
ড্রাগ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সাধারানত এটি ঘটে।
এই রোগটি সাধারণত ভারতবর্ষ ও চীন, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উপ-সাহারান আফ্রিকায় হয়ে থাকে।
হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজে থেকে এই সংক্রমণটিকে প্রতিরোধ করতে পারে ও প্রায় দু-মাসের মধ্যে সংক্রমণমুক্ত হয়ে যায়।
তবে, সংক্রমিত ব্যক্তি সংক্রমণের সময় অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে, কিন্তু এটি সাধারণত সুদূরপ্রসারী কোনো ক্ষতি করে না।
অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে অবশ্য এর  সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদী হয়, যাকে বলা হয় দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস বি।
হেপাটাইটিস বি'র টিকা পাওয়া যায়। 
ড্রাগ ব্যবহারকারী ও উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন অঞ্চলে যাঁরা বসবাস করেন তাঁদেরকে এই টিকাকরণের পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।

হেপাটাইটিস সি:-
 হেপাটাইটিস্ সি  রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ সি ভাইরাস। এটি সাধারণত রক্তে ও খুব অল্প ক্ষেত্রে সংক্রামিত ব্যক্তির লালা, বীর্য বা যোনি তরলে পাওয়া যায়।
এটি সাধারণত যেহেতু রক্তে পাওয়া যায় তাই রক্ত থেকে রক্তের সংস্পর্শে এই রোগটি ছড়ায়।
এই রোগের লক্ষণগুলো অনেকটা ফ্লুয়ের  মত, তাই অনেকে সাধারণ ফ্লুয়ের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলেন।
অনেক রোগীই নিজে থেকে এই সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারেন ও ভাইরাসমুক্ত হয়ে ওঠেন।
আবার অনেকের ক্ষেত্রে ভাইরাসটি দীর্ঘ বেশ কয়েক বছর থেকে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে একে বলা হয় দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস সি।
দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস সি'তে যাঁরা ভুগছেন তাঁরা এন্টিভাইরাল কতগুলো ওষুধ নিতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে কতগুলো অপ্রীতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও দিতে পারে।
হেপাটাইটিস সি'র নির্দিষ্ট কোন টিকা এখনও পাওয়া যায় না।

অ্যালকোহল জনিত হেপাটাইটিস: 

প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করলে এটি দেখা যায়। প্রচুর পরিমাণে মদ্যপানে যকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে এটি ক্রমশ: হেপাটাইটিস রোগ ডেকে আনে। এটির সাধারণত কোনো উপসর্গ দেখা যায় না, একমাত্র রক্ত পরীক্ষা করলে ধরা পড়ে। অ্যালকোহলজনিত হেপাটাইটিসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি যদি মদ্যপান চালিয়ে যায় তবে তা অত্যন্ত ঝুঁকির হতে পারে। সেক্ষেত্রে , অন্ত্রের কঠিনীভবন (সিরোসিস) ও যকৃতের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আরো বিভিন্ন ধরণের হেপাটাইটিস

হেপাটাইটিস ডি :

হেপাটাইটিস্ ডি রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ ডি  ভাইরাস। একমাত্র যাঁদের হেপাটাইটিস্ বি হয়েছে তাঁদের মধ্যে এটি দেখা দিতে পারে।
একমাত্র  হেপাটাইটিস্ বি'র সঙ্গে  হেপাটাইটিস্ ডি বাঁচতে পারে।

হেপাটাইটিস্ :

হেপাটাইটিস্ ই  রোগটির কারণ হল হেপাটাইটিস্ ই ভাইরাস।
এটি হল স্বল্পস্থায়ী ও এর তীব্রতা কম। এক্ষেত্রে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির সংক্রমণ কম।

অটোইমিউন হেপাটাইটিস: 

এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগ নয়। এক্ষেত্রে শ্বেত রক্ত কণিকা যকৃতের মধ্যে আক্রমনণ ঘটায়। এরফলে যকৃতের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত সাংঘাতিক কিছু ঘটতে পারে। এই রোগটির সঠিক কারণ এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। এর উপসর্গগুলোর মধ্যে পড়ে ক্লান্তি, তলপেটে ব্যথা, গাঁটের  ব্যথা, জন্ডিস (চোখ ও চামড়ায় হলুদাভ বর্ণ) ও সিরোসিস। .স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ (প্রিডনিসোলন ) ক্রমশ: কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফোলা ভাব কমাতে পারে ও রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

উপসর্গ:-

হেপাটাইটিস রোগের প্রাথমিক উপসর্গগুলো সাধারণ ফ্লুয়ের মত এবং এগুলোর মধ্যে পড়ে :

👉পেশী ও গাঁটের ব্যথা
👉উচ্চ তাপমাত্রা (৩৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট অর্থাৎ ১০০.৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তারও বেশী)
👉অসুস্থ বোধ।
👉মাথা ব্যথা,
👉মাঝে মধ্যে চোখ ও চামড়ার হলুদ হয়ে যাওয়া, (যা জন্ডিস হতে পারে)

👉দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিসের লক্ষণের মধ্যে পড়ে :-
👉সময় সময় ক্লান্ত হয়ে যাওয়া
👉হতাশা বা বিষণ্নতা,
👉জন্ডিসঅসুস্থতার সাধারণ অনুভূতি

কারণ

যে সমস্ত ভাইরাসের কারণে হেপাটাইটিস রোগটি ঘটে সেগুলো হল : -
ধরণ হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ই,

👉হেপাটাইটিস এনাপ্লাজমা, নোকার্ডিয়া এইরকম নানা ধরণের ব্যাকটেরিয়ার কারণেও ঘটতে পারে।
👉অ্যালকোহলও একটি কারণ

👉অটো ইমিউন অবস্থা :- পদ্ধতিগত লুপাস এরিথম্যাটোসাস,

👉ওষুধ : -
প্যারাসিটামল,  এমক্সিলিন, অ্যান্টিটিউবারকিউলেসিস (যক্ষ্মাবিরোধী) ওষুধ,  মিনসাইক্লিন ও আরো অনেক।
👉ইস্চেমিক হেপাটাইটিস (সংবহন অপ্রতুলতা)
👉বিপাকীয় রোগ:- উইলসন ডিজিজ, গর্ভাবস্থা

রোগ নির্ণয়

হেপাটাইটিসের রোগ নির্ণয় প্রাণ-

১. রাসায়নিক (বায়োকেমিক্যাল) মূল্যায়নের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

২. প্রাথমিকভাবে  ল্যাবরেটরিতে বিলিরুবিন, ক্ষারযুক্ত এমিনোট্রান্সফেরাস (এ এল টি),  এ্যাসপার্টেট এমিনোট্রান্সফেরাস (এ এস টি), ফসফেটেজ, প্রোথ্রম্বিন সময়, মোট প্রোটিন, এলবুমিন, প্রোটীন পরীক্ষা করা হয়।

৩. ই এল আই এস এ দ্বারা নির্দ্ধারিত এন্টি-এইচ সি ভি 'র মাধ্যমে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ই নির্ধারিত হয়।

৪. যকৃতের বায়োস্পির মাধ্যমেও যকৃত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা জানা যায়।

এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

চিকিৎসা

টিকাকরণ

হেপাটাইটিস এ :

 বাচ্চাদের (১-১৮ বছর পর্যন্ত) টিকাকরণে থাকছে ২ বা ৩ মাত্রার টিকা। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রয়োজন বুস্টার ডোজ (প্রথম টিকার মাত্রার ভিত্তিতে ৬ থেকে ১২ মাস)।  টিকার কার্যকারিতা ১৫ থেকে ২০ বছর ও আরো বেশি সময় কার্যকরী হয়।

হেপাটাইটিস বি :

 নিরাপদ ও কার্যকরী হেপাটাইটিস বি'র টিকা ১৫ বছর বা এরও বেশি সময় পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা রাখে।
সাম্প্রতিক, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত যে কেউ এই টিকা নিতে পারেন এবং যে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্করা সংক্রমণের সম্মুখীন বা সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন তাঁরাও টিকা নিতে পারেন।
পরিপূর্ণ সুরক্ষার জন্য ছয় থেকে বারো মাস ধরে তিনটে ইঞ্জেকশন নেওয়া প্রয়োজন।

সাধারণভাবে জ্ঞাতব্য বিষয় :

১. বাথরুম যাওয়ার পর ও খাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধোবেন।
২. ল্যাটেক্স কন্ডোম (নিরোধ) ব্যবহার করুন।
৩. ওষুধের সিরিঞ্জ একে অপরের ব্যবহার করবেন না।
৪. সংক্রমিত ব্যক্তির দাঁত মাজার ব্রাশ, দাড়ি কাটার রেজার ও নখ কাটার যন্ত্র ব্যবহার করবেন না।

প্রতিরোধ:-

১. উপসর্গ থেকে উপশম পেতে বিছানায় বিশ্রাম, অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকা এবং উপযুক্ত ওষুধ গ্রহণ।

২. বেশিরভাগ মানুষ যাঁদের হেপাটাইটিস এ ও ই হয়েছে তাঁরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকে সেরে উঠেছেন।

৩. ল্যামিভুডিন ও এডিফোভির ডিপিভক্সিল জাতীয় ওষুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি সেরে যায়।

৪. পেগিন্টারফেরন ও রিবোভারিনের সংমিশ্রণে হেপাটাইটিস সি'র চিকিৎসা চলে।

৫. হেপাটাইটিস বি বা সি, অথবা ডি যকৃতের কার্যকারিতা একেবারে নষ্ট করে দিলে যকৃতের প্রতিস্থাপন প্রয়োজন।

যে কোন সমস্যায় বিলম্বনা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন সুস্থ্য থাকুন

হেপাটাইটিস সি

হেপাটাইটিস সি এর লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

হেপাটাইটিস সি একটি সংক্রামক রোগ। মানবদেহের যকৃতে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের (HCV) আক্রমণের ফলে হেপাটাইটিস সি  রোগ হয়েছে বলা হয়ে থাকে।
প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই এই অসুস্থতা দীর্ঘমেয়াদী হয়ে থাকে, যাকে ক্রনিক বা দুরারোগ্য হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ বলে।   

লক্ষণ সমূহ :-

বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই প্রাথমিক কোন লক্ষণ প্রকাশ পায়না বলে ক্রনিক হেপাটাইটিস সি শনাক্ত করা কঠিন।
কেবলমাত্র ২৫ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ যেমন- ক্লান্তি, পেশীর ব্যথা ও ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়।
ক্রনিক হেপাটাইটিস সি এর ক্ষেত্রে দুর্বলতা, ওজনহ্রাস এবং রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা হয়।
ক্রনিক হেপাটাইটিস সি এর ক্ষেত্রে লিভারে ক্ষত সৃষ্টি হয় যাকে লিভার সিরোসিস বলে এবং এতে লিভার অকার্যকর হয়ে পরে।
তখন যে উপসর্গগুলো দেখা যায় তা হল- জন্ডিস, গাড় হলুদ প্রস্রাব ও খুব সহজেই রক্তপাত বা আঘাতে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া।
লিভার ক্ষতিগ্রস্থ না হওয়া পর্যন্ত বেশিরভাগ মানুষই বুঝতে পারেন না যে তার হেপাটাইটিস সি হয়েছে।
দশ বছর পর্যন্ত এটি সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি শনাক্ত করা যায়।
রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট যদি পজিটিভ আসে তাহলে বায়োপসি এবং ইমেজিং টেস্ট করতে হয়।

কাদের হয়?: 

হেপাটাইটিস সি তে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে এটি ছড়িয়ে পরে।
এটি হতে পারে- 

১. হেপাটাইটিস সি তে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সূঁচ ও সিরিঞ্জ অন্য কেউ ব্যবহার করলে।

২. হেপাটাইটিস সি তে আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে গর্ভজাত সন্তানে এটি সংক্রমিত হতে পারে।

৩. শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের হতে পারে।

৪. এইডস থাকলে

৫. অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ও অকার্যকর সরঞ্জাম দিয়ে দেহের কোন অংশে ছিদ্র বা উল্কি করা

৬. দীর্ঘদিন যাবত কিডনি ডায়ালায়সিস করলে.

৭. কারাগারে থাকলে,

৮.  ১৯৯২ সালের পূর্বে রক্তদান বা অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে থাকলে

৯.  ১৯৪৫-১৯৬৫ সালের মধ্যে যারা জন্মগ্রহণ করেছেন তারা হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের সর্বোচ্চ প্রকোপের মধ্যে আছেন।      

★চিকিৎসা :-

হেপাটাইটিস সি এর চিকিৎসায় অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ দেয়া হয় শরীর থেকে ভাইরাস দূর করার জন্য।
ঔষধের কোর্স সম্পন্ন করার ১২ সপ্তাহ পরও যেন শরীরে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস খুঁজে পাওয়া না যায় এটাই চিকিৎসার লক্ষ।
গত দশ বছরে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের ঔষধ সহজলভ্য হয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে উন্নত হচ্ছে। সাধারণত ইন্টারফেরন ও রিবাভিরিন এর সমন্বয়ে হেপাটাইটিস সি এর চিকিৎসা করা হয়।
যা দ্বৈত থেরাপি নামে পরিচিত।
ইন্টারফেরন সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং রিবাভিরিন ভাইরাসকে ধ্বংস করে।
হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সম্পূর্ণরূপে নির্মূলের জন্য প্রায় এক বছর ঔষধ সেবন করতে হয়।

ঔষধ গ্রহণের সময়ে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে,

তাহল-  
১. বমি বমি ভাব এবং বমি করা

২. জ্বর ও শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া

৩. পেশীর ব্যথা

৪. চুল পড়ে যাওয়া

৫. কেউ কেউ গুরুতর বিষণ্ণতায় ভোগেন

৬. উচ্চ রক্তচাপ ওথাইরয়েডের সমস্যাও হতে পারে

চিকিৎসা গ্রহণের সময় চিকিৎসকের নিয়মিত রোগীকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

★ ক্রনিক হেপাটাইটিস সি :-

ক্রনিক হেপাটাইটিস সি এর ক্ষেত্রে লিভার এতোটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয় যে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়তে পারে।
লিভার প্রতিস্থাপন করলেই যে রোগমুক্ত হওয়া যাবে এমন কোন কথা নেই। লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পরেও ভাইরাসনাশক ঔষধ সেবন করতে হবে যাতে নতুন লিভারে সংক্রমণ না হতে পারে।

এখন পর্যন্ত হেপাটাইটিস সি এর টিকা আবিষ্কৃত হয়নি।
আপনার চিকিৎসক আপনাকে হেপাটাইটিস এ ও হেপাটাইটিস বি এর টিকা নেয়ার পরামর্শ দেবেন কারণ এই পৃথক দুটি ভাইরাসের কারণেও যকৃত ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং হেপাটাইটিস সি এর চিকিৎসায় জটিলতার সৃষ্টি করে।

★জীবনযাপন ও প্রতিকার :-

যদি পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি শনাক্ত করা যায়,
তাহলে আপনার চিকিৎসক ঔষধের পাশাপাশি আপনার জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দেবেন।
যা আপনাকে দীর্ঘদিন যাবত সুস্থ ও সুরক্ষিত থাকতে সাহায্য করবে যেমন-

১. অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে তা পরিত্যাগ করতে হবে।

২. যকৃতের ক্ষতি করতে পারে এমন ঔষধ সেবন বাদ দিতে হবে।

★সাবধানতা:-

আপনার রক্তের সংস্পর্শে যেন কেউ না আসে সেই বিষয়টি খেয়াল কতে হবে। এজন্য আপনার শরীরে কোন আঘাত পেয়ে রক্ত ঝরলে সেটা যেন অন্য কেউ স্পর্শ না করে,
রেজর ও টুথব্রাশ আলাদা রাখুন, রক্ত, সিম্যান বা বীর্য ও অঙ্গদান থেকে বিরত থাকুন।
আপনার পরিচিত ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিষয়টি অবগত করুন।