দৈনন্দিন অভ্যাসে মেরুদণ্ডের ক্ষতি
______________________
★★ হয়ত খেয়ালও করছেন না অথচ কোনো না কোনো ভাবে মেরুদণ্ডে প্রভাব ফেলছেন প্রতিদিন।
শরীরের কাঠামো ঠিক রাখার পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রের উপরেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই মেরুদণ্ডের সামান্য ক্ষতিও সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অজান্তে প্রতিদিনের সাধারণ কিছু কাজ মেরুদণ্ডের যে ক্ষতি করছে তার কয়েকটি উদাহরণ এখানে দেওয়া হল স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে।
★উঁচু হিলের জুতা:-
নিয়মিত উঁচু হিলের জুতা পরার কারণে মেরুদণ্ডের বাঁক সারিবদ্ধ অবস্থা থেকে সরে যেতে পারে।
এতে শরীরের স্বাভাবিক গড়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বেঁকে যেতে পারে পিঠ ও নিতম্বের হাড়গুলো। তাই প্রতিদিন পরার জুতা হিসেবে বেছে নিন ‘প্ল্যাটফর্ম হিল’, ‘ফ্ল্যাটস’, আর এড়িয়ে চলুন তীক্ষ্ণ হিলের জুতা।
★ভারোত্তোলন ব্যায়াম:-
ব্যায়ামাগারে ভারী ওজন নিয়ে ব্যায়াম করলে তা অবশ্যই প্রশিক্ষকের তদারকিতে করা উচিত। অভ্যস্ত না হলে ভারী ওজন ওঠানো মেরুদণ্ডের মারাত্বক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
★ভারী ব্যাগ বহন:-
ভারী ব্যাগ বহন করার সময় শরীর একদিকে কাত হয়ে থাকে কিংবা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দীর্ঘক্ষণ শরীর বাঁকা হয়ে থাকার কারণে দেখা দেয় ঘাড় ব্যথা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেরুদণ্ড। তাই হাতে ঝুলিয়ে ভারী ব্যাগ বহনের সময় দুই হাতে ওজন ভাগ করে নিতে হবে, আর যতটা সম্ভব ভারী ব্যাগ বহন করা এড়িয়ে চলতে হবে।
★মোবাইলে কথা বলা:-
এই অভ্যাস আমাদের জীবনযাত্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে।
তবে এর কারণে হওয়া স্বাস্থ্যগত ক্ষতির দিকগুলো আমরা হেলার উড়িয়ে দেই।
ঘাড় সামনের দিকে নামিয়ে স্মার্ট ফোন ব্যবহার এবং মাথা একপাশে কাত করে ফোনে কথা বলা মেরুদণ্ডের উপর চাপ ফেলে।
★ভুলভাবে শোয়া:-
পেটের ভরে উপুড় হয়ে শুয়ে ঘুমানো মেরুদণ্ডের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই অভ্যাসের কারণে ঘাড় ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁকের উপর চাপ পড়ে। ফলাফল হতে পারে ঘাড় কিংবা পিঠ ব্যথা।
★ঘরোয়া কাজ:-
কিছু গৃহস্থালী কাজ মেরুদণ্ডের জন্য ক্ষতিকর। ঘরের কাজ না করে তো আর উপায় নেই, তাই এমনভাবে করতে হবে যাতে মেরুদণ্ডের ক্ষতি না হয়।
যেমন, ঝাড়ু দেওয়ার সময় বা মপ দিয়ে ঘর মোছার সময় আমরা সামনের ঝুঁকে থাকি যা মেরুদণ্ডের জন্য অপকারী। আবার ভারী হাঁড়ি মাটি থেকে কোমরে ওঠানোর কারণেও মেরুদণ্ডের ক্ষতি হয়।
তাই এই ধরনের কাজ করার সময় মেরুদণ্ডে যাতে চাপ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
★পিঠে ব্যথায় করণীয়য়-
পিঠ অর্থাৎ কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত যে কোনো কারণে ব্যথা হতে পারে।
যা ‘ব্যাক পেইন’ নামে পরিচিত।
এই ব্যথা যে শুধু বয়স হলেই হয়, তা নয়। এ অসুখের জন্য নানান কারণ থাকতে পারে। অপুষ্টির পাশাপাশি অতিরিক্ত পুষ্টি কখনও কখনও শারীরিক অসুস্থতার কারণ হয়।
বেশি খাবার খেলে তা শরীরে শুধুমাত্র বর্জ্য বাড়ানো ছাড়া বাড়তি কোনো উপকারে আসে না।
যারা খুব বেশি মাংস খেতে পছন্দ করেন তাদের ক্ষেত্রে কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কারণ মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি থাকে।
অতিরিক্ত প্রোটিনের ফলে শরীরের ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। শরীরের জয়েন্টগুলোতে ইউরিক এসিড জমা হয়ে তখন বিভিন্ন গিরা ফুলে যায় ও সেখানে ব্যথা করে।
এটা গেঁটে বাত বা রিউমাটয়েড আথ্রাইটিস নামে পরিচিত। বিভিন্ন ধরনের আথ্রাইটিস সেই সঙ্গে ক্যালসিয়ামের অভাবে ‘ব্যাকপেইন’ দেখা যেতে পারে।
ব্যাকপেইন যে কোনো বয়সের যে কারও হতে পারে।
কোথাও পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত, বার্ধক্য, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি, পুষ্টির অভাব, অতিপুষ্টি এরকম আরও কিছু কারণে ব্যাকপেইন হতে পারে। ব্যাকপেইন হলে ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত যে কোনো জায়গায় ব্যথা প্রকাশ পেতে পারে।
এছাড়া ৪০ পেরনো মহিলাদের ব্যাকপেইনের ঝুঁকি বেশি ।
এর পেছনে কতগুলো কারণ আছে।
যেমন :- ক) শরীরে হরমোনের পরিবর্তন,
খ) ঝুঁকে কাজ করা,
গ) মাতৃত্বকালীন সময়,
ঘ) ভারী জিনিস ওঠানো,
ঙ) পুষ্টির অভাব।
এছাড়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলেও পিঠে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
ক্যালসিয়ামের ঘাটতির ফলে বয়স্ক মানুষের শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা দেখা দেয়। কোমরের হাড় সরে যাওয়া, মেরুদণ্ডে হাড় ক্ষয় বা বৃদ্ধি, ওজন বেড়ে যাওয়া,
বিভিন্ন ধরনের আথ্রাইটিসের কারণে কোমরে ও ঘাড়ে ব্যথা দেখা যেতে পারে।
ঝাড়ু দেওয়ার সময় যদি ছোট ঝাড়ু ব্যবহার করা হয় তখন বেশি ঝুঁকতে হয়। ঝাড়ু ছোট হলে তা ব্যবহার করা উচিত নয়।
এতে কোমর ও মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে।
এ ছাড়া চেয়ারে বসার সময় বেশিক্ষণ সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেও কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
এজন্য শিশুদের পড়ার টেবিলে বসার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে তারা খুব বেশি ঝুঁকে না বসে।
চেয়ারে বসতে হবে মেরুদণ্ড ও ঘাড় সোজা রেখে। এ নিয়মটা বড়দেরকেও মেনে চলতে হবে।”
★ব্যথা থেকে মুক্তি:-
‘ব্যাকপেইন’ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দরকার সুস্থ জীবনা-যাপন।
“চেয়ারে বসার সময় মেরুদণ্ড সোজা রাখুন।
সামনে ঝুঁকে বসবেন না।
খাবারের তালিকায় রাখুন পুষ্টিকর শাকসবজি।
ছোট মাছের কাঁটা ও মুরগির হাড়ে থাকে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম।
তাই এসব খাওয়ার অভ্যাস করুন। শিশুদেরও ছোট মাছ খেতে উৎসাহিত করুন।
“অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি মানসিক চাপ বাড়লেও ব্যাকপেইন হতে পারে।
মানসিক চাপ মুক্ত থাকতে রুটিন অনুসারে কাজ করুন।
নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা অন্য কোনো ধরনের ব্যয়াম নিয়মিত চর্চায় ব্যাকপেইনের ঝুঁকি কমে।
শরীরের ওজন যেন হঠাৎ করে বেড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন।”
ব্যথা কমাতে ব্যায়াম খুবই কার্যকর।
যদি পিঠ ব্যথা হতে থাকে তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে শক্ত কোনো বিছানায় বা মেঝেতে মাদুর বা ম্যাট বিছিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে থাকা।
প্রতিদিন ১৫ মিনিটের এই ব্যায়াম পিঠ ব্যথা কমাতে অনেক সাহায্য করে।
ভিবিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ‘রিলাক্সেশন’ বা বিনোদনের মধ্যে থাকা ও ‘মেডিটেশন’ বা ধ্যান চর্চায় ‘ব্যাকপেইন’ ও ‘স্ট্রেস’ বা মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
মেডিটেশনের ফলে শরীরের মাংসপেশীগুলো শিথিল হয়, এতে ব্যথা উপশম হয়।
মানসিক চাপ যুক্ত পেশা, দুশ্চিন্তা ও ধূমপানের ফলে যে ‘ব্যাকপেইন’ হয় তা দূর করতে ওষুধের প্রয়োজন নেই।
মানসিক চাপ কমাতে রুটিন করে কাজ করুন।
ধূমপানের কারণেও ‘ব্যাকপেইন’ হয়। তাই এই অভ্যাস থাকলে বর্জন করুন।
ব্যথা বেশি হলে তাড়াতাড়ি স্নায়ু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
No comments:
Post a Comment